জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ঐতিহাসিক জয়লাভ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেমব্লি হলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ পেয়েছে ৯৯ দেশের ভোট। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস পেয়েছে ৯১ ভোট। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এই জয় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে আরেকবার উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করল। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে ফের বাংলাদেশি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই জয় শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো উন্নয়নশীল বিশ্ব ও গ্লোবাল সাউথের জন্য এক বড় অর্জন। এটি বহুপাক্ষিকতা, জলবায়ু, ন্যায়বিচার, শান্তি ও সমতার এজেন্ডাকে আরও শক্তিশালী করবে।
এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সীমাবদ্ধতা। মাত্র তিন মাস সময় হাতে পেয়ে বাংলাদেশকে এমন এক বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচার পরিচালনা করতে হয়েছে, যা সাধারণত কয়েক বছরব্যাপী প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশ কার্যত মাত্র তিন মাসের মধ্যেই পাঁচ বছরের সমপরিমাণ কূটনৈতিক তৎপরতা সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনজিএ সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে দেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচার শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সুযোগ না থাকায় এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক ফোরামে অত্যন্ত সক্রিয় ও কৌশলগত প্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনে সফল হয়েছে। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা প্রশংসনীয়। প্রচার ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য সমর্থন আদায় করেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে এবং এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচার চালিয়েছে। বিশেষ করে গত এক বছরে দেশটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রচার পরিচালনা করে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমিত প্রচার দিয়ে বাংলাদেশের জয় গৌরবের। তাদের মতে, এটি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্বাচন, যেখানে একটি ভোট মানে একটি দেশের সমর্থন। ফলে সাইপ্রাসের সঙ্গে যে ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ, তা মর্যাদাপূর্ণ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এত অল্প সময়ে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচার পরিচালনা নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন ও কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই প্রচারে নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো সমর্থন আদায়ে সমন্বিত ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার পর থেকে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবিকতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৬ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী ৪৩টির বেশি দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৪ থেকে ৭ হাজার শান্তিরক্ষী ৯ থেকে ১০টি মিশনে কর্মরত। নারী শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য (প্রায় ২ হাজারের বেশি) এবং বাংলাদেশ প্রথম অল-ফিমেল কন্টিনজেন্ট পাঠিয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ অভিযোজন ও প্রশমনে বিশ্বের অন্যতম সেরা উদাহরণ। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। নারী শান্তিরক্ষা এজেন্ডা, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে অগ্রগতি এবং ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয়দান বাংলাদেশের মানবিকতার অনন্য উদাহরণ, যা বিশ্বের এত দেশের সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল:
জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদ পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে ঘূর্ণায়নের ভিত্তিতে বরাদ্দ হয়। ৮১তম অধিবেশনের (২০২৬-২৭) জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের পালা ছিল। এই গ্রুপে বাংলাদেশ, সাইপ্রাস, ফিলিস্তিনসহ ৫৩টি দেশ অন্তর্ভুক্ত। ফিলিস্তিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় লড়াই সীমিত হয় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে। নির্বাচন ব্যালটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। এটি জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি। এই ফল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে এবং দেশের কূটনৈতিক যাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইপ্রাস ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের (পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয়) অংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্য (২০০৪ সাল থেকে)। তবু জাতিসংঘের আঞ্চলিক গ্রুপিংয়ে এটি এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য। এটি জাতিসংঘের একটি ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম। সাইপ্রাস ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই এই গ্রুপে রয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপে সাইপ্রাসই একমাত্র ইইউ সদস্য দেশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইপ্রাস জিতলে পরপর দুই অধিবেশনে ইউরোপ-সম্পর্কিত দেশ (৮০তম অধিবেশনের সভাপতি জার্মানির অ্যানালেনা ব্যারবক এবং সাইপ্রাস) সভাপতিত্ব করত, যা ঘূর্ণায়ন নীতির মূল উদ্দেশ্য, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতো। ফলে এ দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনে বাংলাদেশের জয়লাভ করায় জাতিসংঘের ঘূর্ণায়ন নীতি বজায় রয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের সঙ্গে তার ৩০ বছরেরও অধিক অভিজ্ঞতা রয়েছে সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি, জাতিসংঘ সেক্রেটারিয়েট এবং ইউএনসিটিএডিতে সিনিয়র পদে কাজ করেছেন। তার ভিশন স্টেটমেন্টে তিনি বহুপাক্ষিকতার পুনরুজ্জীবন, গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর শক্তিশালীকরণ, জলবায়ু, ন্যায়বিচার, শান্তিরক্ষা এবং ছোট-বড় সব সদস্য দেশের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। ১৩ মে জাতিসংঘ ওয়েব টিভিতে অনুষ্ঠিত ইনফরমাল ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সবার সভাপতি হবেন।
নির্বাচনটি ব্যালটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের পালা অনুসারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে (ফিলিস্তিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায়)। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৯৯-৯১ ভোটে জয়লাভ করে। এ জয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে, বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে এবং দেশের কূটনৈতিক যাত্রায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে সভাপতির পদ পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে ঘূর্ণায়নের ভিত্তিতে বরাদ্দ হয়। ৮১তম অধিবেশনের (২০২৬-২৭) জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের পালা ছিল। এই গ্রুপে বাংলাদেশ, সাইপ্রাস, ফিলিস্তিনসহ ৫৩টি দেশ রয়েছে। সাইপ্রাস ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের অংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হলেও জাতিসংঘের আঞ্চলিক গ্রুপিংয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। সাইপ্রাস ২০১৬ সাল থেকে এ পদের জন্য প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি সাইপ্রাস জিতে, তাহলে পরপর দুই অধিবেশনে ইউরোপ-সম্পর্কিত দেশ (জার্মানি ও সাইপ্রাস) সভাপতিত্ব করত, যা ঘূর্ণায়ন নীতির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারত। বাংলাদেশের জয় এ দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
কবে এবং কীভাবে দায়িত্ব নেবেন খলিলুর:
নির্বাচিত হওয়ার পর ড. খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন আগামী ৮ সেপ্টেম্বর। যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। নির্বাচনের পর থেকে তিনি ‘প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট’ হিসেবে পরিচিত হবেন এবং অধিবেশন শুরুর আগে প্রস্তুতিমূলক কাজ, টিম গঠন ও বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেবেন। অধিবেশনের প্রথম দিনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন তিনি এবং এক বছরের মেয়াদে (সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত) সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
আগামী তিন মাসে সিদ্ধান্ত হবে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে থাকবেন কি না : জাতিসংঘ সংবিধানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন সভাপতি হতে নিষেধাজ্ঞা নেই। অনেক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা দুটি দায়িত্বই একসঙ্গে পালন করেছেন। এমনকি ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীও পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন এবং দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেন। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, অতীতের তুলনায় বর্তমানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বাংলাদেশের বড় অর্থনীতি ও জনসংখ্যা বিবেচনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। ফলে তিনি দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন নাও করতে পারেন।
এ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্ভরযোগ্য সূত্র কালবেলাকে বলে, তিনি নির্বাচিত হয়েছেন যা আমাদের দেশের জন্য গৌরবের এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনৈতিক সফলতার অংশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তিনি সরকারের এ পদে থাকবেন নাকি থাকবেন না, এ সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। আগামী তিন মাস তিনি সময় পাবেন এ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এ সময়ের মধ্যে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় তিনি এ পদে থাকতেও পারেন আবার নাও পারেন।
খলিলুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিনন্দন: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিজয়ের পরপর মঙ্গলবার রাত সোয়া ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী তার পোস্টে বলেন, এ অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খলিলুর রহমান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব গর্বের সঙ্গে করবেন এবং বহুপক্ষীয় ইস্যুতে সংযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। নতুন এ দায়িত্ব পালনে তার প্রতি শুভ কামনাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় গতকাল রাতেই এক্স হেন্ডেলে পোস্ট করে শুভেচ্ছা জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়সঙ্কর। পোস্টে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমাদের অভিন্ন অগ্রাধিকারসমূহকে এগিয়ে নিতে এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছি।’
নির্বাচিত হয়ে খলিলুরের বার্তা: নির্বাচনের ফল শুনেই মোনাজাত করে দোয়া করেন ড. খলিলুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরকে দেখা য়ায়। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজয় নিয়ে বার্তা দেন। তিনি বলেন, আমি আন্তরিকভাবে আপনাদের ধন্যবাদ জানাই আমাকে এ সুযোগ দেওয়ার জন্য, যেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর একটি বক্তব্য দিতে পারি।
খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো আমাকে ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছে। আমি বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন, কারণ পরিষদকে জাতিসংঘ সংস্কার, বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডার পরবর্তী প্রজন্মের প্রস্তুতি এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে পরিবর্তন-পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের মতো বিষয় মোকাবিলা করতে হবে।
এসব ঘটবে এমন সময়ে, যখন আমাদের সামনে এরই মধ্যে জরুরি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন বৈষম্য।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য খলিলুর রহমান আগামী অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ভিশন স্টেটমেন্টে নির্ধারিত ছয়টি অগ্রাধিকারে মনোযোগ দেবেন উল্লেখ করে বলেন, শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন ও এসডিজি ত্বরান্বিতকরণ, জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব, মানবাধিকার, মানবিক কার্যক্রম, শরণার্থী ও অভিবাসন এসবে নজর দেবেন। তিনি আরও বলেন, আমার নির্বাচনের পর আমি সাধারণ পরিষদকে বলেছিলাম যে, আমি আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য লালন এবং সৎ আলোচনার জন্য জায়গা তৈরি করতে নিজেকে উৎসর্গ করব যা সবার জন্য ফল বয়ে আনবে এবং সবার মালিকানায় থাকবে। আমি জাতিসংঘ সনদকে অটলভাবে মেনে চলব এবং প্রেসিডেন্টের আচরণবিধি অনুযায়ী কাজ করব।
খলিলুর রহমান বলেন, আমি সব সদস্যরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হব। আমার কাজের ধারাবাহিকতায় আমি সব সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকব। আমি আমার ব্যক্তিগত মতামতকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজের মধ্যে প্রবেশ করতে দেব না। আমি ভিন্নতাকে উপেক্ষা না করে সাধারণ ভিত্তি খুঁজব। আমি আমার অফিসকে ভৌগোলিক, লিঙ্গ ও ভাষাগত ভারসাম্য প্রতিফলিত করে সাজাব। ছোট দেশগুলোর প্রয়োজন মেটাতে প্রেসিডেন্টের অফিসে একটি বিশেষ গ্রুপ তৈরি করা হবে আমার প্রাথমিক অগ্রাধিকারের একটি।
এ সময় তিনি আরও জানান যে, তিনি মহাসচিবের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অফিসের সংগঠন ও সম্পদ নিয়ে পরামর্শ করবেন। তিনি বলেন, আমি সব সদস্যরাষ্ট্রকে প্রেসিডেন্ট ট্রাস্ট ফান্ডে অবদান রাখতে আহ্বান জানিয়েছি, যাতে প্রেসিডেন্টের অফিসের কাজ সম্পাদন করা যায়। আমি তাদের সঙ্গে কাজ করব, যাতে একটি শক্তিশালী ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত হয়। আমি প্রেসিডেন্টের কাজকে এককালীন ঘটনা হিসেবে দেখি না, বরং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি। তাই, ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট, আমি বর্তমান সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিয়ে যাব।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সংগঠনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধির একটি প্রধান উপায় হলো জাতিসংঘের জনগণকে আমাদের সাফল্যের গল্পগুলো বলা। জাতিসংঘ প্রেস কর্পস এ কাজ সম্পাদনের জন্য সর্বোত্তম মাধ্যম। এই উদ্দেশ্যে আমি আপনাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করছি। আমি একটি কার্যকর যোগাযোগ টিম গড়ে তুলব, যারা আমার প্রেসিডেন্সির পুরো সময় আপনাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে।
বিজয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করল: খলিলুর রহমানের এ বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য অনেক সম্মান ও গৌরবের বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ এ ইমেজ বিশ্বে কাজে লাগাতে পারবে। এতে দেশের অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক কালবেলাকে বলেন, বিশ্বে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে আবারও তুলে ধরল। এটি একটি বড় অর্জন। বেশ কিছু বছর, গাজার যুদ্ধ, সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার ঘটনা এসব নিয়ে বিশ্বে জাতিসংঘ তার প্রসঙ্গিকতা হারিয়েছিল। অনেকটাই নীরব ছিল তারা। এতে মানুষের মধ্যে একটা ক্ষোভও ছিল। এসবে তাদের কোনো কনসার্ন আমরা দেখতে পাইনি। খলিলুর রহমান সে প্রত্যাশা দেখিয়েছেন। আশা করা যায়, তিনি সেগুলো করতে পারলে জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিতকা বাড়বে। এ ছাড়া বাংলাদেশের জন্য বিশাল সুযোগ। একবার নির্বাচিত হলে ঘুর্ণন প্রক্রিয়ার ফলে অনেক বছর লাগে সুযোগ পেতে। আর এশিয়া মানেই যে বাংলাদেশ জিতবে তা নয়। ফলে এ সুযোগ বাংলাদেশ এত বছর পর ফের পেয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য অনেক গৌরবের এবং সম্ভাবনার। ৯৯ দেশ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এটা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ইমেজকে কাজে লাগিয়ে গ্লোবাল সাউথে তার শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।











