
এস এম মেহেদী হাসান:
সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগ, যা একজন মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে এখনো এই রোগ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক কুসংস্কার, ভয় ও ভুল ধারণা। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার বদলে ঝাড়ফুঁক বা অলৌকিক চিকিৎসার দিকে ঝুঁকে পড়ে পরিবার। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা পেলে সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন। বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবসে এই রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা এবং বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
আজ ২৪ মে, বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো “সিজোফ্রেনিয়া” শব্দটি অনেকের কাছেই অপরিচিত। আর যারা নামটি জানেন, তাদের মধ্যেও এ রোগ নিয়ে রয়েছে নানা ভুল ধারণা, ভয় ও কুসংস্কার। অনেকেই এটিকে জিন-ভূতের আছর বা ‘পাগলামি’ হিসেবে দেখেন। অথচ সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগ, যার চিকিৎসা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে এখনো বড় সংকট রয়েছে।
সিজোফ্রেনিয়া কী?
সহজ ভাষায়, সিজোফ্রেনিয়া এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগী এমন কিছু শুনতে বা দেখতে পারেন, যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। একই সঙ্গে তিনি এমন কিছু বিশ্বাস করতে পারেন, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় হ্যালুসিনেশন ও ডিলুশন।
চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা ও দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার সংকট
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রোগ শনাক্তে দেরি হওয়া এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার বদলে কুসংস্কারনির্ভর পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়া।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. পলাশ রায় বলেন,
“আমাদের দেশে সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের বড় সংকট হলো সময়মতো চিকিৎসকের কাছে না আসা। রোগের শুরুতে অনেক পরিবার রোগীকে কবিরাজ, ওঝা বা মাজারে নিয়ে যায়। ফলে রোগটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।”
তিনি বলেন, সিজোফ্রেনিয়া পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে রোগীকে স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। “প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা, নিয়মিত ফলোআপ এবং পরিবারের ধৈর্য,” যোগ করেন তিনি।
ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও পারিবারিক দুশ্চিন্তার মধ্যেও তথ্য ও মতামত দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য ডা. পলাশ রায়কে বিশেষ ধন্যবাদ।
প্রচারণার ঘাটতি: অন্তরালে রয়ে যাওয়া মানসিক স্বাস্থ্য
বাংলাদেশে সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে জনসচেতনতা এখনো সীমিত। জাতীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারণা খুব কম দেখা যায়।
সিনিয়র সাংবাদিক আনহার সামশাদ বলেন, “গণমাধ্যম রাজনৈতিক বা চটকদার খবরকে যতটা গুরুত্ব দেয়, মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ততটাই আড়ালে থেকে যায়। সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কনটেন্ট খুব কম।”
তার মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও বড় পরিসরে সচেতনতা কার্যক্রম চোখে পড়ে না।
একই বিষয়ে লেখক ও কলামিস্ট সালেহ আহমদ (স’লিপক) বলেন, “আমাদের সমাজ এখনো মানসিক রোগকে ‘পাগলামি’ বলে অবজ্ঞা করে। ফলে রোগী চিকিৎসার আগে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। লেখালেখি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি।”
বিজ্ঞান কী বলছে?
সিজোফ্রেনিয়ার জিনগত ও পরিবেশগত কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ভারতের বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির (BHU) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলোক শর্মা।
তিনি বলেন, “সিজোফ্রেনিয়া কোনো অলৌকিক বিষয় নয়। এটি মূলত মস্তিষ্কের কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক ট্যাবুর কারণে রোগ গোপন রাখার প্রবণতা বেশি।”
তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে রোগীর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। “এটিকে অন্য দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগের মতোই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত,” বলেন তিনি।
একজন মায়ের লড়াই
সিজোফ্রেনিয়া শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। মানিকগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক রোগীর মা জাহানারা বেগম (ছদ্মনাম) বলছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা।
“আমার ছেলে যখন উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করল, তখন সবাই বলল জিনে ধরছে। দুই বছর কবিরাজ আর ওঝার পেছনে ঘুরেছি। পরে ডাক্তার দেখানোর পর জানতে পারি ওর সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, নিয়মিত ওষুধের পর তার ছেলে এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। কিন্তু সামাজিক আচরণ এখনো তাদের কষ্ট দেয়। “আত্মীয়-স্বজন অনেকেই দূরে সরে গেছে। কেউ বুঝতে চায় না যে সে অসুস্থ, পাগল না,” বলেন তিনি।
শেষ কথা
বাংলাদেশে সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু চিকিৎসা, সচেতনতা ও সামাজিক সহমর্মিতার ক্ষেত্রে ঘাটতি এখনো বড় বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক রোগকে ভয় বা লজ্জার বিষয় হিসেবে না দেখে চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবসে তাই প্রয়োজন কুসংস্কার নয়, সহানুভূতি; অবহেলা নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ও সামাজিক সমর্থন। আক্রান্ত মানুষকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পরিবার, গণমাধ্যম, চিকিৎসক ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এস এম মেহেদী হাসান: সদস্য- আহ্বায়ক কমিটি, বাংলাদেশ রিপোর্টার কাউন্সিল (বিআরসি)











