ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে বিএনপি। স্বতন্ত্র প্রার্থী একদিকে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেন, অন্যদিকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে দল। এ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
অপরদিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে আছেন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার পাঁচ বারের মেয়র, ন্যাশনাল টি কোম্পানির পরিচালক, জেলা বিএনপির সদস্য মহসিন মিয়া মধু।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) নির্বাচনী এলাকায় আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। চা বাগান অধ্যুষিত এ আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল। এবার তারা না থাকায় বাগানের চা শ্রমিকদের ভোটব্যাংক সুনির্দিষ্ট কোনো দলের নামে নির্ধারিত নয়। জয়ের জন্য তাই এ আসনের সকল প্রার্থীর নজর চা বাগানের চা শ্রমিককের দিকে।
স্থানীয় ভোটার বলছেন, এই আসনে ভোটযুদ্ধ হবে জমজমাট হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে। এ আসনে দুই শক্তিশালী বিএনপি নেতা ও তাদের নেতাকর্মীদের মাঝে মনোনয়ন নিয়ে বিভেদ দৃশ্যমান। শুধু তাই নয়, বিএনপির দলীয় প্রার্থীর মূল চ্যালেঞ্জ একই দলের এক নেতার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় নেতা এবং জনপ্রিয়তার কারণে তিনি বিএনপি প্রার্থীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
এ আসন থেকে আরও মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুর রব, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব প্রীতম দাশ, এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা নূরে আলম হামিদী, জাতীয় পার্টির জরিপ হোসেন ও বাসদের আবুল হাসান।
জানা গেছে, ১১দলের সমঝোতার কারণে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা নূরে আলম হামিদী মাঠে রয়েছেন। জামায়াত ও এনসিপি আর মাঠে নেই। মাঠে শুধু আছেন খেলাফত মজলিস, বিএনপি ও বিএনপি বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রাথী, জাতীয় পার্টি, বাসদের প্রার্থীরা। দলের একটি সূত্র বলছে, ভোট কাটাকাটির হিসাবে এই আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থীর জন্য লড়াইটা বেশ কঠিন হবে।
হেভিওয়েট প্রার্থী, স্থানীয় নেতা মহসিন মিয়া মধু ও মুজিবুর রহমানের মধ্যে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস এই আসনের আওতাধীন নির্বাচনী এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। দুই নেতার অনুসারীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে নিজ নেতার প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায়, সাধারণ মানুষ ও চা শ্রমিকদের মন জয় করার ওপর নির্ভর করছে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ।
সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং গরিব-অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে স্থানীয়দের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছেন বিএনপি প্রার্থী মুজিবুর রহমান। তাঁর ফাউন্ডেশন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
অন্যদিকে তৃণমূল থেকে বর্তমান অবস্থায় উঠে আসা দলটির স্থানীয় নেতা মহসিন মিয়া মধু বরাবরই এলাকার মানুষের নাগালে অবস্থান করেন। আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের সান্নিধ্যে থাকা মহসিন মধু মিয়া বিশেষ কারণেই সবার নজরে রয়েছেন। তবে এই দুই প্রার্থীর কারণে দলের মধ্যে সৃষ্ট বিভেদ এবং একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে সমালোচনামূলক কথাবার্তা ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে মহসিন মিয়া মধু এ আসন থেকে বাজিমাত করতে পারেন। তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার পাঁচবার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।
তবে কমলগঞ্জ উপজেলার রাঙ্গাটিলা গ্রামের বিএনপি সমর্থক আব্দুল হক ও ছাতির আলী জানান, বিএনপি ঘরানার নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ দিন দিন বাড়ছে। তাঁদের ভোট বিএনপির বাক্সেই পড়বে না।
কমলগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য গোলাম কিবরিয়া শফি জানান, বিএনপির প্রার্থী হাজী মুজিব এখন পর্যন্ত উপজেলা বিএনপির নেতাদের নিয়ে কোনো মতবিনিময় সভা করেননি। মনে প্রাণে বিএনপির রাজনীতি করেন যারা তারা দলীয় প্রতীকে ভোট দেবেন। তবে প্রার্থীকে আরও জনসম্পৃক্ত হতে হবে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, মহসিন মিয়া মধু মেয়র থাকাকালে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে ছিলেন। শ্রীমঙ্গল পৌর এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। তিনি চা বাগানের মালিক। যে কারণেই চা বাগানে তাঁর একটা ভালো অবস্থান রয়েছে। তিনি শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ করছেন।
বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া মধু বলেন, দলীয় প্রার্থী কোনো কারণে বিজয়ী হতে না পারলেও বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী একজন হিসেবে এই আসন ধরে রাখতেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একাধিক রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছি।
তিনি আরও বলেন, ২০০১ সালে বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়েও আওয়ামীলীগের প্রার্থীর কাছে হেরে ছিলাম।











